সিলিকন ভ্যালি ঘিরে আমাদের স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা

প্রশ্নটা মৌলিক। আপনি ইনোভেশন চান। আপনি চান যে দেশে নতুন উদ্যোক্তা-উদ্ভাবক তৈরি হোক, নতুন নতুন উদ্ভাবন ঘটুক। আপনি আমাদের স্বপ্ন দেখান যে সেইসব উদ্যোগ-উদ্ভাবন ঘিরে দেশে একটা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠবে। যা দেশের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেবে, শ্রমসর্বস্বতা থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে ধাবিত হবে। কিন্তু, আপনার চাওয়াটা কোন স্তরের, তা আপনাকে প্রথমেই ঠিক করতে হবে, এবং আপনার লক্ষ্য অনুযায়ী মানুষের কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে হবে। আপনি যদি আলু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন  বা ২০০% কর্মক্ষমতার জ্বালানীবিহীন বিদ্যুৎ জেনারেটর—  এই ধরনের শিশুতোষ উদ্ভাবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন তবে ঠিক আছে। যেভাবে চলছে, ভালোই চলছে। দেশে প্রায়ই আলুর বাম্পার-ফলন হচ্ছে, বিষাক্ত জাহাজ ভাঙা লোহা আছে, শিক্ষিত বেকার যুবক আছে লাখে-লাখে। প্রয়োজনীয় সকল উপাদান পর্যাপ্ত পরিমাণে উপস্থিত। এখন কেবল “জয় বাংলা” বলে বেকার যুবকদের হাতে বিনামূল্যের আলু, লোহা ইত্যাদি তুলে দিয়ে দিন গুনতে থাকুন। একদিন না একদিন নিশ্চয়ই আমাদের স্বপ্ন পূরণ হবে!

silicon-valley-banner

কিন্তু, আজকের বাস্তবতা বেশ কঠিন। পৃথিবী অনেক এগিয়ে গিয়েছে। আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে ইনোভেশন এখন সহজ কাজ না। ইউটিউব, ড্রপবক্স, হোয়াট্সঅ্যাপ বা সমপর্যাযের অ্যাপসমূহ এবং এসব যে প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর চলছে, সেসবের জন্মস্থান- সিলিকন ভ্যালির ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখুন একবার। ২০১৪ সালে এসে যাদের সাথে তাল মেলানোর স্বপ্ন দেখছি, তাদের অন্তত ষাট বছরের ইতিহাস আমাদের জানা উচিত। আজকের সিলিকন ভ্যালি হঠাৎ করে ঈশ্বরের কুন শব্দে গড়ে ওঠেনি। অনেক মানুষের ত্যাগ, পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং সর্বোপরি কিছু মৌলিক নিয়ামক, যেমন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, শিক্ষক-অভিভাবক থেকে অনুপ্রেরণা, চিন্তার স্বাধীনতা, ভেনচার ক্যাপিটাল বা অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট, সহজলভ্য আবাসন, সরকারি বিনিয়োগ, দক্ষ আইন-বিচার ব্যবস্থা ইত্যাদি উপাদানের দীর্ঘ সময়ের মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে সিলিকন ভ্যালি1 গড়ে উঠেছে।

শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা

ক্যালিফোর্নিয়ার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বেসরকারি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখা হয় সিলিকন ভ্যালির বিকাশের ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর্থিক চাহিদা মেটাতে কিছু জমি লিজ দেন স্ট্যানফোর্ডের তৎকালীন ডিন ফেডেরিক টারম্যান। সেখানেই ফেডেরিকের পরোক্ষ সহাতায় গড়ে ওঠে স্ট্যানফোর্ডের সাবেক শিক্ষার্থী ও বহিরাগতদের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে হিউলেট-প্যাকার্ড অন্যতম। এর পাশাপাশি, বেল ল্যাবোরেটরিস এবং সেখানে কর্মরত প্রকৌশলীদের হাত ধরে আরো কিছু প্রতিষ্ঠানের ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠে আজকের ইন্টেল। পরবর্তী দশকগুলোতে পূর্ব-আমেরিকার দৃশ্যমান শোষণ-বৈষম্যকে মোকাবেলা করে পশ্চিম-আমেরিকাকে স্বনির্ভর করে তোলার স্বপ্ন নিয়ে আবারও এগিয়ে যায় স্ট্যানফোর্ডের নেতৃত্ব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে শুরু থেকেই বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে এসেছে সিলিকন ভ্যালির বিকাশে।

ফেরত আসি বাংলাদেশে। প্রসঙ্গের প্রয়োজনেই একটু গোড়া থাকে শুরু করতে হচ্ছে— নিজের ইচ্ছেমত বিষয় বেছে নেয়ার সুযোগ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অনুপস্থিত। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তো বটেই, আমাদের হাইস্কুল পর্যায় থেকেই শুরু হয় মেধাতালিকা অনুযায়ী ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর বিজ্ঞান-মানবিক-বাণিজ্য- ইত্যাদি বিভাগ চাপিয়ে দেয়া। সেই ধারাবাহিকতায় পার হয় মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিকও। উচ্চশিক্ষার জন্য ন্যূনতম মানের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কম সংখ্যক ছাত্রই সুযোগ পায়, আর সুযোগ পেলেও তাদের অধ্যায়নের বিষয় নির্বাচন হয় সেই মেধাতালিকা অনুসারেই। কিন্তু কে ভালো ডাক্তার হবে, কে ভালো ইঞ্জিনিয়ার, সাহিত্যিক বা সাংবাদিক হবে তা আপনি আমাদের তথাকথিত শিক্ষাব্যবস্থায় মেধার বিচারে নির্ণয় করতে পারেন না। অন্যদিকে, নিজের অধ্যায়নের বিষয় বা পেশাকে যারা ভালবাসেন, তাদের সফলতার সম্ভবনা থাকে সর্বোচ্চ। কাজের প্রতি ভালবাসা না থাকলে ব্যক্তি নিজে যেমন কর্মজীবনে অসুখী হয়, তেমনই সমাজও তার কাছ থেকে বেশি কিছু আশা করতে পারে না। একটা বিষয়ে পড়ালেখা করে অন্য বিষয়ের পেশায় গেলে তা অবশ্যই সেই পেশাকে ভালবেসেই যাওয়া হয়, তাতে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, নিজের পছন্দের বিষয় বেছে নেয়ার এই ধাপটি আমাদের দেশের অধিকাংশ ছাত্রেরই উপযুক্ত সময়ের অনেক পরে, এমনকি সময় একেবারে শেষ হয়ে যাওয়ার পরে ঘটে। বিনয়ের সাথে বলতে হচ্ছে, অধ্যায়নের বিষয়ের সাথে পেশা ও নেশার মিল না থাকায় এভাবে আমাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ থেকে যাচ্ছেন “প্রাতিষ্ঠানিক অশিক্ষিত”। ইকোনমিস্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতক বেকার বসে আছেন2। সামান্য কিছু ভাগ্যবান শিক্ষার্থী, যাদের সুযোগ-সামর্থ ও প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর ধৈর্য আছে, তারা পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে, অথবা অধিত বিদ্যার বাইরের পেশা গ্রহণ করছেন, হচ্ছেন স্বশিক্ষিত। আসল কথাটি হলো, এই অশিক্ষিত-বেকার জনগোষ্ঠীর প্রকৃত পড়ালেখা শুরু হয় কর্মজীবনে প্রবেশের পরে।

তথ্যপ্রযুক্তি বা সংস্লিষ্ট পেশায় যারা আছেন, তাদের অবস্থা আরো এক ধাপ নীচে— ইংরেজি ও বিজ্ঞানে পর্যাপ্ত দখল না থাকায় তাদের অনেকে নিজের পড়াটা নিজে পড়ে নিতেও অস্বস্তি বোধ করেন। কেউ কেউ আবার ভিডিও টিওটোরিয়ালের আশ্রয় নিতে চাইলে সেই কচ্ছপ-গতির ইন্টারনেটে “ঠেইল্যা ঠেইল্যা” চলা স্ট্রিমিং বিপর্যয় তো আছেই। ওয়েব-ওপেন সোর্সের কথায় এলে বলা যাক, এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ হয় কীভাবে। রেফারেন্স বা রিইউজ, যে উদ্যেশ্যেই হোক, আপনি যদি নতুন একটা কাজের প্রস্তুতি হিসেবে আট-দশখানা প্রোজেক্ট চেকআউট করতে যান, আপনার প্রতিটির জন্য সময় লাগবে কম-বেশি আধঘণ্টা!

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কর্মমুখী বাস্তব শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার ভয়াবহ অনুপস্থিতি আছে আমাদের দেশে। ইউরোপের মতো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষকতাকে অতি মহান ও জগতের সাথে সম্পর্কহীন এক বিশেষ পেশার “মর্যাদা” দিয়ে সমাজ-অর্থনীতি থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। বিনয়ের সাথে বলি, যে জগৎ সম্পর্কে শিক্ষক নিজেই অন্ধকারে, সে নিয়ে শিক্ষার্থীকে কী নির্দেশনা দেবেন? ক্যালিফোর্নিয়া বা বড় পরিসরে আমেরিকার দিকে তাকালে আমরা দেখব যে শিক্ষকতা ওখানে অপার্থিব-অতিপবিত্র কোনো বিষয় নয়— বিবিধ পেশার মানুষেরা অতিরিক্ত বা খণ্ডকালীন কাজ হিসেবে শিক্ষকতা করেন, এটাই ওখানে স্বাভাবিক। নিজ নিজ পছন্দ ও বিষয়ভিত্তিক কর্মমুখী উদ্যোগ নিতে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে বিবিধ পেশার এই শিক্ষকেরা। আর, আমেরিকান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত আসন তো থাকেই, উপরন্তু সেসব আসনের সিংহভাগের অধিকার সংরক্ষিত থাকে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য। বিষয় নির্বাচনে পূর্ণ স্বাধীনতা তো স্কুল জীবনের শুরু থেকেই থাকে।

চিন্তার স্বাধীনতা

সমাজকে আমূলে বদলে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে, প্রচলিত চিন্তা-ভাবনা-রীতি পেছনে ফেলে, বহু ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগের পথ পাড়ি দিয়ে আজকের সিলিকন ভ্যালি গড়ে উঠেছে। বড় পরিসরে উৎপাদিত প্রতিটি পণ্যই সমাজে কিছু না কিছু পরিবর্তন আনে, কিন্তু সে পরিবর্তন সাধারণত মুখ্য উদ্দেশ্য হিসেবে আসে না; মুখ্য থাকে মুনাফা, সম্প্রসারিত বাজার, ইত্যাদি। অন্যদিকে সিলিকন ভ্যালির যেসব উদ্ভাবন আজ আমাদের সামনে উদাহরণ হিসেবে হাজির হয়, তার প্রতিটির যাত্রা শুরু গোটা সমাজ পরিবর্তনের, সমাজের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে থাকা কোনো চক্রকে ভেঙে চুড়মার করার সাহসী স্বপ্ন নিয়ে। অতি উন্নততর প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চর্চা পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও কম হয়নি। কিন্তু, সিলিকন ভ্যালি একেবারেই আলাদা। কম্পিউটার, ওয়েব, স্মার্টফোন ইত্যাদি যেসব হাইটেক পণ্য আজ আমাদের হাতে হাতে, শুনতে আশ্চর্য লাগবে যে, এসবের পেছনে কিন্তু উন্নত থেকে উন্নতর প্রযুক্তি আবিষ্কারে নেশা নয়, এর পেছনে কাজ করেছে কোন না কোন কল্যাণমুখী মানবীয় স্বপ্ন। কাগজে-কলমে বা টাকার অংকে প্রবৃদ্ধি আর সামাজের সমৃদ্ধি, দুটো ভিন্ন বিষয়। সিলিকন ভ্যালি আমাদের যা শেখায় তা হলো, স্বপ্ন দেখতে জানতে হয়। দু-চারজনকে নয়, গোটা সমাজকেই দেখতে হয় এই জাগরণের স্বপ্ন3। তবেই পরিবর্তন আসে।

অন্যদিকে, আমাদের দেশের কথা বলতে গেলে কিছু উদাহরণই যথেষ্ট। বুদ্ধিমান পাঠক বুঝে নেবেন সমস্যাগুলো কোথায়। আমাদের স্কুলগুলোতে কোমলমতি ছেলেমেয়েদের বিস্কুট-দৌড় বা চকলেট-দৌড়কে একটা প্রতিযোগিতার বিষয় হিসেবে শেখানো হয়। একটু বড় হলে শেখানো হয় বেশি “মার্কস” পাওয়াই পড়ালেখার মূল উদ্দেশ্য। আর শিক্ষাজীবনের শেষের দিকে শেখানো হয় যে ভালো একটা চাকরি করে একজন উন্নতমানের “খরিদদার” হওয়াই জীবনের চূড়ান্ত সফলতা। স্বপ্ন দেখতে আমাদের শেখানো হয় না। তাই, আমাদের চিন্তা-ভাবনা, স্বপ্ন এগুলো হয় থাকেই না বা থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি বা বড়জোড় পরিবারের গণ্ডিতে গিয়ে শেষ‌ হয়। “সমাজ” নিয়ে জ্ঞান আমাদের প্রাইমারি স্কুলের সামাজিক বিজ্ঞান পাঠ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে।

ভেনচার ক্যাপিটাল বা অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট বনাম ব্যাংকিং

সিলিকন ভ্যালির উঠে দাঁড়ানোর পেছনে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের ভূমিকা অন্যতম। এর প্রভাব সেখানে এত বিস্তর ও নিবিড় যে ভেঞ্চার ক্যাপিটালকে সজ্ঞায়িত করতেই একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্টো দিক থেকে সিলিকন ভ্যালিকে টেনে আনা হয়4। এই ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কী তা জানতে হলে বুঝতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক পূঁজির সীমাবদ্ধতা। প্রযুক্তিতে অর্থায়ন যেমন উচ্চমাত্রায় লাভজনক, তেমনই এর ঝুঁকিও অনেক বেশি। তাই বলে তো আর মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি দমে থাকতে পারে না। একসময় বিভিন্ন যুদ্ধকে উপলক্ষ্য করে রাস্ট্রগুলো এমন ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ করত। কিন্তু এখন দিন বদলেছে, ধংসের বদলে সৃষ্টিশীল উদ্ভাবনের ঝুঁকছে মানুষ। তাই গত শতকের শেষার্ধ থেকে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তি অর্থায়নের প্রতিশব্দ। আর এর শেকড়ে আছে ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় জনগণের অর্থ ব্যায়ের রুচিবোধ— আমরা লক্ষ্য করি, ওরা যতটা না অর্থ উপার্জন করতে পছন্দ করেন, তার চেয়ে বেশি আনন্দ খুঁজে পান কোনো না কোনো কল্যাণকর কাজে তা ব্যয় করতে! কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে এর উৎস হলেও সামান্য করে দেখার কিছু নেই— বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী আজ আমেরিকার চাকরি বাজারের ১১ শতাংশ আর জিডিপির ২১ শতাংশ আসে সরাসরি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম মাপকাঠি হিসেবেও তাই স্বীকৃতি দেয়া হয় ভেঞ্চার ক্যাপিটালের যোগানকে।

এদিকে আমাদের দেশের অলস টাকার মালিকেরা সাধারণত কানাডা বা লন্ডনে বাড়ি কেনা, দুই ঈদসহ বছরে কয়েকবার বিদেশ-ভ্রমন-শপিং বা দেশে বসেই বিবিধ বিনোদন-সেবা ইত্যাদি ভোগ করে সুখী থাকতে পছন্দ করেন। অন্যদিকে, মধ্যবিত্ত শ্রেণী টাকা খাঁটিয়ে কিছু করা বলতে বড়জোর বুঝে থাকেন ব্যাংকে ফিক্সড-ডিপোজিট বা সরকারি বন্ড কিনে বসে থাকা— এক কথায় আমাদের বন্ধ্যা ব্যাংকিং খাতে। আমাদের বুঝতে হবে যে কেবলামত্র টাকাই সমাজের জন্য কোন সুখ-সমৃদ্ধি বয়ে আনে না। টাকা কাঠ-প্লাস্টিকের স্কেলের মতো একটি ইন্টসট্রুমেন্ট মাত্র। আপনার টেবিলে একটা স্কেলের বদলে দশটা স্কেল থাকলে তা কোন কাজে আসবে না। অথচ আপনি ঐ একটা স্কেল সঠিভাবে ব্যবহার করার মাধ্যমে অনেক রকম অর্থবহ কাজ করতে পারবেন। টাকাও তাই।

ওদিকে প্রতিষ্ঠানিকভাবে আপনি যদি কোন উদ্যোগের জন্য পূঁজি চান, আপনাকে যেতে হবে ব্যাংকের কাছ। সেখানে এমন কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে যা একজন নতুন উদ্যোক্তার জন্য কেবল কঠিনই নয় অসম্ভবও বটে। এবং শেষ পর্যন্ত আপনার উদ্যোগের ধারেকাছেও ঝুঁকির কোন চিহ্ন পাওয়া গেলে পূঁজি আপনার কাছে ধরা দেবে না। কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে, তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট প্রায় শতভাগ উদ্যোগ হয়ে থাকে কম-বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আরো পরিতাপের বিষয়, এমন ঝুঁকি বনাম সম্ভবনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা-যাচাই করে দেখার মতো যোগ্য জনবলই নেই আমাদের আর্থিক প্রতিষ্টানগুলোর। তাই গড়পড়তায়, যে কোন তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোগ ব্যাংকগুলোর কাছে ভয়ংকর ও দূর্বোধ্য এক বিষয়। আর ঠিক এই শূন্যস্থানটি পূরণ করতে পারে ভেনচার ক্যাপিটাল। অন্যদিকে, উচ্চহারের সুদসহ আরো কী কী প্রতিবন্ধকতা আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরে, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা যাবে। আপাতত, এটুকু জানা যথেষ্ট যে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মতো টাকা দিয়ে নতুন টাকা তৈরির নির্বুদ্ধিতা চর্চা করছে মাত্র। এর বাইরে উন্নয়নের নামে যতটুকু কাজ হচ্ছে, তার অর্ধেক সেই “বাহিরে ফিটফাট” থাকার প্রচেষ্টা, আর বাকি অর্ধেক সরাসরি “লুটপাট”। লুটপাট এইজন্যই বলা হচ্ছে যে, মোটা দাগে আমাদের ব্যাংকিং খাতের চিত্র এমন যে আপনি কল্যাণমূলক কোন উদ্যোগ যদি নিতে চান, তবে আপনি যত চেষ্টাই করুন না কেন, টাকা পাবেন না। কিন্তু অসৎ উদ্যেশ্য ও লক্ষ্যে কিছুদিন কাজ করেই খুব সহজে যে কেউ ব্যাংকগুলো থেকে বিরাট অংকের টাকা লুটে নিতে পারেন বলে আমরা দেখেছি। সম্পূর্ণ ব্যবস্থার মধ্যে বড় বড় ফাঁকফোকড় না থাকলে অবশ্যই এমন সম্ভব হতো না।

দেশের ফরেন রিজার্ভ বাড়ছে বা পার-ক্যাপিটা ইনকাম বাড়ছে, এতে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ এবং সম্ভব্য উদ্যোক্তা-শ্রেণীর পুলকিত হওয়ার কিছু নেই। আকাশ-পাতাল কোন অঘটন না ঘটলে এই রিজার্ভ আজ হোক, কাল হোক, কানাডা, ইংল্যান্ড বা অন্য কোন দেশের উদ্দেশ্যে নিজের ঠিকানা খুঁজে নেবে। যে দেশের মানুষ জনপ্রতি ৭৫ হাজার টাকা বা ১০০০ ডলার খরচ করে টি-২০ উদ্বোধনী কনসার্ট দেখার ক্ষমতা রাখে, সে দেশের দৈন্যতা আর্থিক নয়, মানসিক বটে।

সহজলভ্য আবাসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা

সিলিকন ভ্যালির তৎকালীন সহজলভ্য আবাসন অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে উদ্যোক্তা-শ্রেণীকে আকৃষ্ট ও ধারন করার কাজে। ভৌত যোগাযোগব্যবস্থার কথা আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই।

সেই তুলনায় আমাদের দেশের কথা বলতে গেলে বলতে হয় যে আমরা সবদিক দিয়েই আছি দৈন্যতার মধ্যে। আপনি মফস্বল-শহর বা গ্রামে ইন্টারনেট চাইলে আপনাকে আঁটকে থাকতে হবে ই-ট্রাফিক জ্যামে, যেখানে ২০ কেবিপিএস কচ্ছপ গতির ইন্টারনেটে, যে ফাইল সিলিকন ভ্যালির লোকেরা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ডাউনলোড করে, সে ফাইল পেতে আপনার সময় লাগবে কয়েক ঘণ্টা। অন্যদিকে, এইসব সেবা-সুবিধা কিছুটা হলেও উন্নত যেখানে, অর্থাৎ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহানগরীতে যদি আপনি বাধ্য হয়েও থাকতে বা কাজ করতে চান, তাহলে ইন্টারনেট সুবিধা কোনরকমে নিশ্চিত হলেও আপনাকে দৈনিক ৮-১০ কর্মঘণ্টার মধ্যে শুধুমাত্র ট্রাফিক জ্যামে অপচয় করতে হবে ২-৫ ঘণ্টা। তাই বলা চলে, কেবলমাত্র দালাল-ফড়িয়া ছাড়া এমন আপাদমস্তক ভারসাম্যহীন ভুখণ্ডে অন্য কোন উন্নত পেশা বিকশিত হওয়ার স্বপ্ন দেখাটাই হাস্যকর।

আমরা জানি, মাথার কাজ চিন্তা করা- শরীরের বিভিন্ন অংশে সংকেত পাঠানো। হৃদপিণ্ডের কাজ রক্ত পাম্প করা; রক্তের কাজ শরীরের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা। আবার, পেটের কাজ খাদ্য পরিপাক করে শরীরে শক্তি যোগান দেয়া। তেমনই হাত-পায়ের কাজ বহিঃজগতের সাথে শরিরের কার্যক্রম-চলাফেরা সমন্বয় করা। এই নিয়ে মানবদেহের গঠন। মানবদেহের মতো রাষ্ট্রেরও একটা নির্দিষ্ট গঠন থাকা দরকার। কিন্তু অত্যন্ত দূঃখজনক যে বাংলাদেশের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ “ঢাকা” শহরে। আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ঢাকার বিশেষ কিছু অঞ্চলে। এদেশের মানুষ গরু-গাঁধা, অলস, ফাঁকিবাজ, নৈরাজ্যকারী- এমন সব দোষ আপনি সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়ে পার পেতে পারেন, কিন্তু একটা দেশের ভৌগলিক কাঠামো নিয়ে যুগ-যুগ ধরে এমন ছেলেখেলা করে আসার দায় দেশের ক্ষমতাসীন এবং অতীত ক্ষমতাভোগী সকল পক্ষকেই নিতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদী সরকারি বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা

সিলিকন ভ্যালির প্রাথমিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সে দেশের সরকার ছিলেন অন্যতম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন পড়েছিল রেডিও এবং ইলেক্ট্রনিক্স প্রযুক্তির। সেজন্য সরকার নিজেও বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার মাধ্যমে বিনিয়োগ করেছিল এই বন্দরকেন্দ্রিক এ রাজ্যে। শুধু তাই নয়, আমেরিকা সরকার ও সামরিক বাহিনীর মতো বড় ক্রেতার উপস্থিতিতে ওখানে গড়ে উঠেছিল নতুন এক বাজার। একই ধারাবাহিকতায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয়েছে আরপানেট- যার পরবর্তী সংস্করণ আজকের ইন্টারনেট। এসব উদ্ভাবনের সবগুলোই ধীরে ধীরে আমেরিকান সরকার-সামরিক-বাহিনীর হাত ঘুরে সাধারণের হাতে পৌঁছেছে। বড় পরিসরে দেখলে আমেরিকা সরকারের সেই বিনিয়োগের প্রাথমিক ফল পেতে সময় লেগেছে কমপক্ষে ২০ বছরের মতো।

এবার বাংলাদেশে ফেরত আসি। যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি বা সুযোগ যা-ই বলুন, বর্তমান বিশ্ব এবং বাংলাদেশের জন্য অপ্রাসঙ্গিক বিষয়। কিন্তু সামর্থ থাকলে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করতে কোন বাঁধা তো নেই। জানা যায়, জনসংখ্যার দিক দিয়ে আমরা পৃথিবীর ৮ম বৃহত্তম দেশ। সেই ক্ষেত্রে, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা যে সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে দেখা হয়, তার জন্য অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ-উন্নয়নের জন্য অনগ্রসর ও ছোট অন্যান্য দেশের অপেক্ষায় বসে থাকা নির্বুদ্ধিতাই বটে। যেমন ধরুন, ২০০৫ সালে স্থাপিত দক্ষিণ-পূর্ব-এশিয়া থেকে পশ্চিম-ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত সিমিউই-৪ সাবমেরিন ক্যাবলের জন্য সন্মিলিতভাবে সব দেশের মোট খরচ পড়েছিল ৫০ কোটি ডলার। দিন দিন এসব প্রযুক্তির খরচ কমে আসে, বাড়ে না। পরবর্তিতে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ একটি অতিরিক্ত ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তায় ধুকছে, যা কিছুদিন পরপরই একমাত্র সিমিউই-৪ ক্যাবলের বিভিন্ন অংশ কাঁটা পড়ার সাথে সাথে তীব্রভাবে অনুভুত হয়। আবার মেরামতের পরে প্রয়োজনীয়তার কথাটি হাওয়ায় মিলিয়েও যায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে আমাদের সরকার বছরের পর বছর অপেক্ষায় আছে। কখন অন্যদেশের দয়ায় সিমিউই-৫ আলোর মুখ দেখবে তার জন্য। কতটা অবিবেচক ও অদূরদর্শী আমরা যে সিমিউই-৪ এর অনুরূপ, একই পথে বিস্তৃত আর একটি ক্যাবল যাকে সিমিউই-৫ না বলে সিমিউই-৪.১ বলাই যুক্তিযুক্ত, তার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষায়‌ রয়েছি। অথচ অদক্ষ হাতের খসড়া হিসেবে দেখা যায়, অন্য কোন দেশ এগিয়ে না এলেও কেবলমাত্র বাংলাদেশের নিজ মালিকানায় চট্টগ্রাম থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত, অর্থাৎ সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে বিস্তৃত প্রকৃত অর্থে বিকল্প একটা সাবমেরিন স্থাপন করতে খরচ হবে ২০ কোটি ডলার। যে বাংলাদেশের বৈদেশিক রিজার্ভ ২০০০ কোটি ডলার ছুঁতে যাচ্ছে, সেই সরকারের জন্য এমন প্রয়োজনীয় অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ভারী মনে হয় কেন? এর পেছনে কি কোন মহলের হীন উদ্যেশ্য রয়েছে? খতিয়ে দেখা দরকার।

দেশের রাজনীতিই ঠিক করে দেয় একটা সমাজ-রাষ্ট্র কোন দিকে অগ্রসর হবে। বর্তমান-ভবিষ্যত চিন্তা করে সরকারকে মাঝেমধ্যে হলেও বড় কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়, বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু আমাদের সরকারের কার্যকলাপ দেখে ভ্রম হয়, যেন সবকিছুই করা হচ্ছে যতটা না প্রকৃত ফল পাওয়ার জন্য, তার চেয়ে বেশি তড়িঘড়ি করে একটা কিছু প্রমাণ করার জন্য। এখন গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে সরকারকে প্রমাণ করার চেষ্টা করতে হয় যে দেশ ডিজিটাল হচ্ছে বা হয়েছে। অথচ, সত্যিকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ যাদের হাতে গড়বে, তাদের যদি প্রশ্ন করেন যে গত পাঁচ বছরে তথ্যপ্রযুক্তির পথে কতটুকু উন্নতি পেয়েছে বাংলাদেশ, তবে উত্তরগুলো তেমন সুবিধার হবে না। পেপ্যাল আসেনি বাংলাদেশে। কেউ হয়তো উত্তরে বলতে পারেন, ই-কমার্স তো চালু হয়েছে। হ্যা, হয়েছে। কিন্তু ব্যাংককেন্দ্রিক ক্রেডিট-কার্ড আর পেপ্যাল এক বস্তু নয়। পেপ্যাল এমন এক উদ্যোগ যা ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষের কাজ অনেক সহজ ও বাঁধাহীন করার লক্ষ্য নিয়ে ই-কমার্স খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। আবার, ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দিক দিয়ে বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের শ-দুয়েক দেশের তুলনায় একেবারে তলানির দিকে পড়ে আছে। খুচরা পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবার মান নিয়ে এখানে নতুন করে বলার কিছু নেই। যদিও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল, বারবার পাইকারি দাম কমিয়েও কোন লাভ হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে পাইকারি দাম কি আসলেই ততটা কমেছে? না। সিলিকন ভ্যালিতে যেখানে প্রতি এমবিপিএস ১ ডলারের নীচে নেমে এসেছে, সেখানে আমরা এখনও এমবিপিএসের মূল্য উঠিয়ে রেখেছি ৬০ ডলারে। অথচ আপনারা আলাপ করছেন যে ঢাকা সিলিকন ভ্যালির এক্সটেনশন হবে?5 বুঝে-শুনে বলছেন এসব কথা? উদ্দেশ্য যদি শুধুই তামাশা হয়, ঠিক আছে, যা খুশী বলতে পারেন।

কিন্তু, দয়া করে রাস্তা-ঘাটে ফ্রি ওয়াইফাই দেয়ার মতো কাজ করে প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন না যে আপনারা সঠিক পথে আছেন। একটু সহজ করে বলি, আপনি যদি জনসাধারণকে সুপেয় পানি খাওয়াতে চান, আপনাকে গভীর-নলকূপ আমদানি বা তৈরি করতে হবে সবার আগে। বাকি কাজটা সেসব এলাকার ক্ষুদ্র-মাঝারী উদ্যোক্তারা করে নেবে। অন্যভাবে বললে করিয়ে নিতে হবে। কিন্তু তা না করে আপনি সরকার নিজেই যদি চায়না থেকে পাইকারি অর্ডার দিয়ে সুদৃশ্য জগ-গ্লাস এনে মোড়ে-মোড়ে দাঁড়িয়ে বিতরণ করার মহৎ প্রকল্প হাতে নেন, তবে আপনার বা আপনার পছন্দের ঠিকাদারের কিছু ব্যবসা হবে বটে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হবে না। আবার, এমনও আশা করে ভুল করবেন না যে মাত্র পাঁচ-সাতদিন ট্রেনিং দিয়েই স্কুলপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদেরকে অ্যাপ-ডেভেলপার বানিয়ে ফেলবেন। এর বদলে চিন্তা করুন ওদের কিভাবে ইংরেজি ও বিজ্ঞানে কেবল পাস বা ‘এ’ গ্রেড নয়, প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত করে তুলবেন; তাতে অন্তত কয়েক বছরের মাথায় ফল পাওয়ার আশা করতে পারেন।

আইন ও বিচার ব্যবস্থা

আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে অবিশ্বাস্য হলেও ইতিহাস থেকে জানা যায়, আমেরিকা কম্পিউটার-তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রয়োজনে বিশেষভাবে আইন প্রণয়ন6 বা সংশোধন, এবং তার সাথে সাথে নতুন আইনের জন্য উপযুক্ত জনবল প্রয়োজনমত নিয়োগ দিয়েছিল। রাশিয়ার সাথে প্রতিযোগিতায় নিজ দেশের উদ্যোক্তাদের বিশেষ সহায়তা দান করাকে সে দেশ যৌক্তিক দ্বায়ীত্ব হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছে। সিলিকন ভ্যালিকে ঘিরে বেসরকারি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানসমূহের শাখাও স্থাপিত হয়েছে সময় আর বাজারের প্রয়োজনে7। আর, আমরা কোথায় আছি? তথ্যপ্রযুক্তির জন্য যুগোপযোগী আইন বলতে আমরা পেয়েছি, সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা বা মানহানিকর বক্তব্য বন্ধের ব্যবস্থাটাই। এখনো পর্যন্ত আমাদের আইটি, টেলিযোগাযোগ, ই-কমার্স এগুলো সব আলাদা আলাদা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিচ্ছিন্ন কিছু “বিষয়” মাত্র। এসব মন্ত্রনালয়ের আইন, লক্ষ্য ও কাজের মধ্যে নেই বিন্দুমাত্র সামঞ্জস্য ও ধারাবাহিকতা। বড় পরিসরে আইটি সেক্টরকে আমরা এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রিয়ভাবে বিশেষ গুরুত্বই দিতে পারিনি। যেরকম দেশ-অর্থনীতির স্বপ্ন আমরা দেখি, তেমনটি গড়তে হলে প্রয়োজন, পর্যাপ্ত ক্ষমতাসম্পন্ন যোগ্য ব্যক্তি যিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সরাসরি ও নিবিড়ভাবে সমন্বয় করতে সক্ষম হবেন। ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো সহজ কাজ এটা না।

এবং, একদিন আমরাও…

এই হলো “সিলিকন ভ্যালি ঘিরে আমাদের স্বপ্ন” বনাম “ডিজিটাল বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার” তুলনামূলক কিছু খন্ডচিত্র। আমরাও চাই এদেশ থেকে ইউটিউব, হোয়াটসএ্যাপ, ড্রপবক্স এমন বিশ্বজয়ী অ্যাপ তৈরি হোক। আমরাও চাই আমাদের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে উঠুক, আমাদের সমাজ সমৃদ্ধ হোক। অথচ, এসব সম্ভব করার পেছনে যে নিয়ামকগুলো কাজ করার কথা, তার প্রতিটির বিপরীতে আমাদের জন্য রয়েছে শুধুই দৃশ্যমান ব্যর্থতা নয়তো হতাশা। সিলিকন ভ্যালির অনেক সফল ব্যক্তিত্বের শেকড় সন্ধান করলে দেখা যাবে যে তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। কিন্তু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হলেও ওদের জীবনবৃত্তান্তের প্রায় শতভাগে দেখা যায় যে, শৈশব থেকে ওদের পরিচর্যা হয়েছে আমেরিকার মাটিতে। শুরু থেকে সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যে মাত্রায় পরিচর্যা, সহায়তা ও অনুপ্রেরণা ওরা পেয়েছে, ওসবই ওদের সফলতার মূল উপাদান। অথচ, বাংলাদেশের মাটিতে তার সিকিভাগও নিশ্চিত না করে আমরা পরিচর্যা ছাড়াই ফল পেতে চাই বটে।

  1. A History of Silicon Valley -Arun Rao and Piero Scaruffi []
  2. লক্ষ্যহীন উচ্চশিক্ষা, কর্মহীন স্নাতকেরা -প্রথম-আলো []
  3. “Dreams are not those you have while sleeping, but those that don’t let you sleep.” – A.P.J. Abdul Kalam []
  4. Early venture capital and the growth of Silicon Valley -Wikipedia []
  5. সিলিকন ভ্যালির সিস্টার সিটি হবে ঢাকা – banglanews24.com []
  6. Origins of modern private equity → Small Business Investment Act of 1958 -Wikipedia []
  7. Silicon Valley → History → Law firms -Wikipedia []

Leave a Reply