বাংলাদেশে পেপাল: ২০১৫ পর্ব

গত প্রায় এক যুগ ধরে বাংলাদেশের বহু সংখ্যক আইটি/আইটিইস কর্মী বিদেশী আউটসোর্সিং মার্কেটে শ্রম বিক্রি করে আসছেন। হাতে গোনা কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এই বাজারের বেশিরভাগ কাজই সন্মানের দিক থেকে দিনমজুর শ্রমিক-মিস্ত্রি পর্যায়ের বলা চলে। আর্থিকভাবে যে প্রাচুর্য দেখা যায় তা-ও আহামরি কিছু না- দেশীয় মূদ্রার মান অতি নিম্ন হওয়ার কারণেই ৫০-১০০ ডলারও বিরাট অংকের টাকা মানে হয় অনেকের কাছে। আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের দিনমজুর শ্রমিকেরা যেমন হেড মিস্ত্রির সাথে কাজ করতে করতে এক সময় পূর্ণাঙ্গ মিস্ত্রি/কন্ট্রাক্টর হয়ে ওঠে, প্রায় একই প্রক্রিয়ায় আউটসোর্সিং মার্কেটে কর্মরত এই ডিজিটাল শ্রমিক জনগোষ্ঠির একটি উল্লেখযোগ্য অংশের দক্ষতা ও জ্ঞানের ব্যাপক উন্নয়ণ হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশিদের জন্য বিভিন্ন প্রকারের ডিজিটাল সেবা/পণ্য বানিয়ে/মেরামত/রক্ষণাবেক্ষণ করে প্রচুর অভিজ্ঞতাও সঞ্চয় করেছেন তারা। তাই গত কয়েক বছর ধরে এই ক্ষুদ্র অথচ অত্যন্ত সম্ভবনাময়ী জনগোষ্ঠির সামনে এখন (অন্য কারো কাছে শ্রম বিক্রি না করে) নিজ নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন সেবা বা ডিজিটাল পণ্যের উন্নয়ণ এবং বিক্রয় করার সম্ভবনা হাতছানি দিচ্ছে। কিন্তু…

যুদ্ধে পরাজিত সেনাপতিকে রাজা জিজ্ঞেস করিলেন, হারের কারণ কি? সেনাপতি কহিলেন, ১০১ কারণ আছে হুজুর। রাজা কহিলেন, বলো একে একে। সেনাপতি কহিলেন, প্রথম কারণ হুজুর, বারুদ ভিজে গিয়েছিল। রাজা আর বাকি কারনগুলো শুনলেন না। বারুদ ভেজা থাকলে যেমন যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়, উপযুক্ত ব্যাংকিং/পেমেন্ট ফ্যাসিলিটি ছাড়া ব্যাপক আকারে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ই-কমার্সও কখনো আলোর মুখ দেখবে না।

উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আমেরিকায় ক্রেডিট/ডেবিট কার্ডের চল কয়েক যুগ ধরে। কিন্তু অপরিচিত বিক্রেতার কাছে কার্ড নাম্বার শেয়ার করতে ক্রেতাদের অনিহা তখনও ছিল, এখনও আছে। প্রতিবার কেনাকাটার সময় বহু-ডিজিটের কার্ড নাম্বার টাইপ করাও আরেক ঝামেলা ছিল। এ ধরণের বেশ কিছু জটিলতার কারণে কার্ডসর্বস্ব ই-কমার্স অতোটা জনপ্রিয় হয়নি যতটা গত এক যুগে গুনানুপাতিক হারে এর বিস্তার হয়েছে। ই-কমার্সের ব্যাপক প্রসার ও উন্নয়নে পেপালের ভূমিকাকে অতি গুরুত্বের সাথে দেখা হয় [১]। অনলাইন বেচা-কেনার প্রতিটি ধাপকে যথাসম্ভব সহজ ও নিরাপদ করতে পেপাল প্রথমত, ক্রেতার কার্ড/ব্যাংক নাম্বার বিক্রেতার কাছে গোপন রাখে। কার্ড নাম্বার মনে রাখার বা সরাসরি ব্যাংক থেকে টাকা পরিশোধ করতেও পেপাল ক্রেতাকে সর্বোচ্চ সহায়তা দেয়। আবার কোন বিক্রেতা যদি পেমেন্ট নিয়ে প্রতিশ্রুত প্রোডাক্ট/সার্ভিস ডেলিভারি না দিয়ে প্রতারণা করে, তা প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন পলিসি ও এনফোর্সমেন্টের ব্যবস্থা করেছে পেপাল। এভাবেই উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করার মাধ্যমে ই-কমার্সকে অন্য এক পর্যায়ে নিয়ে এসেছে পেপাল। যেখানে ছোট-বড় সকল ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে আস্থা-বিশ্বাস-ঝুঁকির যে ধোঁয়াশা শুণ্যস্থান থেকে যায়, পেপাল নিজে তার ব্র্যান্ড ইমেজ ও সময়োপযোগী পলিসি দিয়ে তা পূরণ করে দেয়। বিশ্বের সর্বাধিক দেশে তো বটেই, পেপালের নিজ দেশ আমেরিকায় এখনও ভোক্তাদের প্রথম ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী পছন্দ পেপাল। অস্বীকার করার কোন উপায় নেই, গুগল যেমন সার্চ ইঞ্জিনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, ঠিক তেমনি ই-কমার্সে পেপাল।

ফিরে আসা যাক শুরুতে উল্লেখ করা সম্ভবনার সেই হাতছানিতে। আমাদের এখানে যারা এতোদিন বিদেশি আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে আসছেন, তারা কিছু উদ্ভাবন বা তৈরি করলে তা আইটি প্রোডাক্ট বা সার্ভিসই হবে। যৌক্তিকভাবেই তারা জামা-কাপড়-জুতা বা বাচ্চাদের প্লাস্টিকের খেলনা তৈরি করবেন না। কিন্তু বাস্তবতা এটাই যে আপনি কোন একটি বিশেষ মার্কেট সেগমেন্টের প্রয়োজন মাথায় রেখে বিশেষায়িত একটি সফ্টওয়্যার-এ্যাজ-আ-সার্ভিস লঞ্চ করলে আপনার নিজ দেশের ভিতর থেকে ১০ জন কাস্টমার খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়বে। তাই সীমিত ঝুঁকিতে লাভজনক হতে হলে আপনার আইটি সার্ভিসের মূল বাজার হতে হবে উন্নত বিশ্ব যার শুরুতেই রয়েছে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো। একজন আমেরিকান কনস্যুমার যখন কোন অপরিচিত স্টার্টাপের কাছে কিছু কিনতে যাবেন, তিনি যদি দেখেন যে বিক্রেতা সরাসরি তার কাছে ক্রেডিট কার্ড নাম্বার চাইছে বা সম্পূর্ণ নতুন/অপরিচিত কোন পেমেন্ট পদ্ধতি অবলম্বন করতে বলছে, তখন তিনি দশবার চিন্তা করবেন, এবং শেষ পর্যন্ত হয়তো মন পাল্টে ফেলবেন। কিন্তু মধ্যবর্তী এই পেমেন্ট প্রোসেসরটি যদি হয় তার অতি পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য পেপাল, তবে অনেকাংশে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনি নিশ্চিন্ত মনে ট্র্যানজেকশনটি সম্পন্ন করবেন। এটাই বাস্তবতা। এই কারণেই সাবেক এবং বর্তমান আউটসোর্সিং শ্রমিকেরা বাংলাদেশে পেপালের অনুপস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সরব। পেপালের জন্য জোর দাবী মূলত তাদেরই। খোদ আমেরিকার ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রিতে পেপাল কিভাবে পরিবর্তন এনেছে তা তারা দেখতে দেখতো বড় হয়েছেন। তারা জানেন যে পেপাল বাংলাদেশে থাকলে তাদের সামনে একটি বিশাল বাজার উন্মুক্ত হবে। তা না হলে বিদেশিদের অধিনে কাজ করা শ্রমিক হিসাবেই তাদেরকে এক সময় অবসর গ্রহণ করতে হবে।

পেপালের নিজস্ব হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের ২০৩টি দেশে পেপাল সেবা দিয়ে থাকে। সব দেশে সেবার পরিসর সমান-সমান নয়, কিন্তু পেপালের মৌলিক ফিচারগুলো অধিকাংশ দেশেই উপস্থিত। এদিকে গত বছর ২০১৪ সালে নাইজেরিয়া সহ আফ্রিকার ১০টি অবশিষ্ট দেশেও পেপাল চালু হয়েছে। এর বাইরে থেকে যায় কেবল আমেরিকা সরকার কতৃক নিষিদ্ধ কয়েকটি দেশ সহ “ইরাক, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান” [২]। যুদ্ধবিদ্ধস্ত ইরাক ও আফগানিস্তানে পেপাল না থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে; থাকার পক্ষে বরং কোন বিশেষ কারণ নেই। আর বাকি থাকে “পাকিস্তান ও বাংলাদেশ”। তাই এই অভিষপ্ত প্রজন্মের মনে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে “বাংলাদেশ ও পাকিস্তান” কি অর্থনৈতিকভাবে আজও স্বাধীন হয়েছে, নাকি ব্রিটিশদের রেখে শোষণ যন্ত্রের কল-কব্জার ভিতর আজও পিষে মরছে।

আমাদের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, আইসিটি পরামর্শক সজীব আহমেদ জয় ও ট্রেড অর্গানাইজেশন বেসিস গত কয়েক বছর ধরে দৌড়ঝাপ করছেন পেপালকে বাংলাদেশে টেনে আনার জন্য। এর আগে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর মুখেও আমরা বিভিন্ন আশ্বাস শুনেছি যে পেপাল বাংলাদেশে আসছে। আজ ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকৃত কাজ কিছুই দৃশ্যমান হয় নাই। সর্বশেষ অগ্রগতি হচ্ছে এই বছর পেপাল ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মত কিন্তু অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের একটি আমেরিকান কোম্পানি “জুম” (Xoom)-কে খরিদ করছে। সেই সূত্র ধরে পেপাল আমাদের সফররত প্রতিমন্ত্রী ও তার টিমকে আশ্বস্ত করেছে যে পেপাল নিজে নয়, তবে সেই জুম বাংলাদেশে আসবে। আমরা জাতি হিসাবে কতটা অক্ষম ও অসহায় হলে আমাদেরকে এভাবে অপমান করতে পারে পেপাল তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। আর, অপমানের সুযোগ যখন আমরাই করে দেই তখন দোষটা আমাদেরও কম নয়।

এদিকে এর একটি ভিন্ন বিশ্লেষণও আছে। যেহেতু পেপাল মূলত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এবং যেহেতু পেপালের সাথে যাবতীয় আলোচনা ও দেনদরবার করার এখতিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে, সেহেতু এসব দপ্তর থেকেই পেপালের সাথে যোগাযোগ করা যুক্তিসঙ্গত হতো। বৈদেশিক আর্থিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যন্ত কঠোর বলে আমরা জানি। পেপাল কেন এখানে আসছে না তা নিয়েও নির্ভরযোগ্য কোন সুত্র থেকে ব্যখ্যা নেই পেপালের তরফ থেকে। কিন্তু ধারণা করা যেতে পারে যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থবিষয়ক কঠোর, অনমনীয় ও একচোখা একগুচ্ছ নীতিমালার কারনেই পেপাল বাংলাদেশ থেকে দূরে থাকা নিরাপদ মনে করছে। একই কারনে প্রতিবেশি দেশ ভারতেও পেপালের আগমন ও অস্তিত্ব বেশ সুখকর নয় বলে জানা যায় [৩]। লাভের চেয়ে বিড়ম্বনা বেশি হলে সৎ উদ্দেশ্যে কোন প্রতিষ্ঠানই এখানে আসতে চাইবে না। আমাদেরকেই বুঝতে হবে যে প্রয়োজনটা আমাদের, ওদের নয়।

তাই বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রানীতি সংশোধন ও বৈশ্বিক অর্থনীতির সাথে হালনাগাদ করতে না পারলে পেপালের এদেশে আসার সম্ভবনা প্রায় শুণ্য। সহজ বাংলায়— সরকার দেশে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবেশ করাতে খুবই আগ্রহী, কিন্তু একবার প্রবেশের পর তা সাধারণ জনগন কে-কিভাবে-কেন খরচ করবেন তার শতভাগ নিয়ন্ত্রণ সরকার হাতছাড়া করতে নারাজ। এই নীতিতে অটল থাকলে পেপাল এদেশে আসলেও তা শুধুই (একমুখী) রেমিটেন্স আনার কাজে ব্যবহার করা যাবে। ই-কমার্স সংশ্লিষ্ট পেপালের অন্যান্য সকল সেবা সরকারের নীতির কারণে বাধাগ্রস্থ হবে। পুর্ণাঙ্গ সেবা দিতে পেপাল যেহেতু সক্ষম হবে না, সে কারণেই তারা তাদের সীমিত রেমিটেন্স সেবা- জুম (Xoom) কে বাংলাদেশে চালু করতে সম্মত হয়েছে।

[১] http://www.flavourmag.co.uk/emergence-paypal-e-commerce-industry/
[২] https://en.wikipedia.org/wiki/PayPal#Local_restrictions
[৩] http://www.zdnet.com/article/paypal-puts-india-on-hold/

Leave a Reply