ভ্যালু এডেড সার্ভিসেস, পুশ সেল এবং মোবাইল গ্রাহকের পকেট কাটা

বাংলাদেশের মোবাইল অপারেটরগুলো মনে হয় “পাগলা” হয়ে গেছে — শুধু পাগলা না, একেবারে নেশাগ্রস্ত, পথভ্রস্ট উন্মাদের মত আচরন করছে তারা। শুধু সরাসরি পারে না বলতে, দে দে, দে-রে খাই দে-রে খাই! শুধু রিচার্জ করিয়ে তাদের লক্ষ্য অর্জন হয় না। যে কোন উপায়ে ক্রেডিটগুলো খরচ তো করাতে হবে। তাই, পুশ সেলের জন্য অবিরাম এসএমএস, কল ও অন্যান্য উপায়ে গ্রাহকে অতিষ্ট করে ছাড়ছে তারা। মিউজিক রেডিও, নামায ও হাদিস, ইংলিশ গ্রামার আরো নানারকম বিনোদন। সবকিছুর সাথেই “ফ্রী” কথাটা যুক্ত, না হয় বিরাট কোন উপহার, যেমন স্যামসাং গ্যালাক্সি এস৩ বা কোবারনির গুরু জেতার সুযোগ। কিন্তু পাবলিক এটাকে কিভাবে নিচ্ছে, বা এতে তারা কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা যেন দেখার কেউ নেই। এখন চলুন কিছু উদাহরন দেখি:

আমি আমার গ্রামীনফোনের ব্যালেন্স চেক করতে গেলেই কাজের কথার সাথে আরও কিছু মেসেজ ফ্রী আসে: 

ইংলিশ গ্রামারের প্রতি আমার কোন বিশেষ দুর্বলতা নেই। আর যদি থাকেও, তা হলে মোবাইল/এসএমএস দিয়ে গ্রামার কতটুকু শেখা হবে তাও চিন্তার বিষয়। তাই আমি না হয় এড়িয়ে গেলাম, কিস্তু আমার বাসার কেয়ারটেকার, কাজের বুয়া বা ছোট ভাই-বোন সহজেই এগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। অনেকে আবার না বুঝে বা ঠিকমত খেয়াল না করেই এগুলোকে কোন “ফ্রী” অফার, বোনাস বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভেবে টিপে বসেন। তারপর যা হবার তাই হয়, হাত-পা বেধে নিয়ে পকেট কাটা শুরু হয়।

গ্রামীনফোনের কাস্টমার কেয়ারের মোটামুটি উচ্চপর্যায়ে ধমক-ধামক দিয়ে আমার মোবাইলে প্রমোশনাল এসএমএস আসা বন্ধ করেছি। কিন্তু রবিতে এখনও করা হয়নি। এবার দেখি রবি’র এসএমএস বিনোদন, প্রতি দুই-তিন দিন পরপর আমাদের কাছে পাঠানো হয়, তা কেমন দেখায়:

রবি আমাদেরকে নতুন করে বাংলাদেশ দেখাচ্ছে। ইন্টারনেটকে এমবি’তে মেপে কিভাবে উপভোগ করতে হয় তা শেখাচ্ছে। এক ক্লিকে অনেক এপ ফ্রী দিচ্ছে, কিন্তু ওগুলো ঘরে আনতে আপনাকে ব্রাউসিং চার্জ ঠিকই দিতে হবে – কী দারুণ ভন্ডামি! তারপর, উন্মাদদের জন্য গ্যালাক্সি এস৩ উন্মাদনার কথা না-ই বা বললাম। সবই ফ্রী, কিন্তু চার্জও প্রযোজ্য। এক কথায় “চরম বিনোদন”!

আমার নানী, যিনি চোখে একটু কম দেখেন, তিনিও এগুলো দেখে আমাকে প্রায়ই ডেকে পাঠান, “শান্ত, দেখ তো কি পাঠাল আমাকে গ্রামীনফোন থেকে?”। আমি তাকে বলি, নানি, আপনি ফোন নিয়েছেন কি জন্য? কথা বলার জন্য না? তাহলে কথা বলুন, কেউ ফোন করলে রিসিভ করুন। এর বাইরে কি হচ্ছে তাতে মনোযোগ দেয়ার দরকার নেই। মনোযোগ দিলেই বিপদ!

কিন্তু তারপরও কথা থাকে। ইদানিং শুরু হয়েছে ভয়েস কল করে উৎপাত করা। সময়ে অসময়ে ঘুমিয়ে আছেন না খেতে বসেছেন, তখন কল আসল। উঠে গিয়ে ফোন তুললেন, তারপর শুনে দেখুন তো কেমন লাগে:

এবার দেখি বাংলালিংক কি করছে। শ্রদ্ধেয় বড় ভাই আব্দুন নুর তুষারের ফেসবুক স্ট্যাটাস:

তুষার ভাইয়ের পোস্টের নীচে কমেন্টগুলো পড়লেই বিস্তারিত জানতে পারবেন। আর বিস্তারিত বলা দরকার নেই।

এবং, আরেকজন ভুক্তভোগী গ্রামীনফোন গ্রাহকের প্রতিক্রিয় যা এলিজাবেথ ডি কস্তা পোস্ট করেছেন আইটিক্যাব-এর ফেসবুক পেজে:

তার কথা থেকে যা আন্দাজ করা যাচ্ছে, তা হলো কোন এক রাতে এক বা একাধিক ভ্যাস/কন্টেন্ট সার্ভিস বাবদ তার একাউন্ট থেকে অবশিষ্ট সব টাকা কেটে নেয়া হয়েছে। এবং, আমি নিশ্চিত, এটা প্রথমবার না — বেশ কয়েকবার বা বহুবার এটা ঘটার পরই তিনি এই পোস্ট করেছেন। অন্যদের মত ব্যলেন্স দেখতে গিয়ে বা উড়ো কল রিসিভ করে হয়তো তিনি নিজের অজান্তেই “হ্যা” বলে বসেছেন, তারপর আর কি! মোবাইলে টাকা রিচার্জ করা হচ্ছে আর কাটা হচ্ছে — সমান তালে।

এভাবেই চলছে পকেট কাটা। মানুষ মাত্রই পুশ সেলে ভুল করে হলেও সাড়া দেবে – এটাই স্বাভাবিক। পুশ সেলের মেসেজ বা রেকর্ডগুলোর ভাষাই থাকে এরকম, যাতে মানুষ সাড়া দেয়। কিন্তু এটা যে কত লাগামহীনভাবে হতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের মোবাইল অপারেটরগুলো আমাদেরকে দেখাল। তার উপর এগুলো বন্ধ করার কোন পথ যখন গ্রাহককে বলে দেয়া হয় না, তখন তা হয়ে ওঠে আরও ভয়াবহ। এলিজাবেথের মত আরও কত ভাই-বোন, যারা ১০০০ টাকা রিজার্জ করার সামর্থ রাখে না, বরং ২০-৫০-১০০ করে রিচার্জ করে (এবং সাথে সাথে তা কেটে নেয়া হয়) তাদের কথা আর কি বলব! এখনকার মত দুঃখ প্রকাশ আর সমবেদনা জানিয়েই শেষ করছি। তবে হ্যা, আর বেশিদিন হয়তো চলতে দেওয়া হবে না এসব — অনেক হয়েছে। শুধু পুশ সেল বন্ধই না, এযাবৎ যত টাকা এভাবে চুরি করা হয়েছে তা জরিমানা সহ ফেরত দিতে হয় কিনা তাও দেখা হবে।

Leave a Reply