আধুনিক ইন্টানেটের ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ

হাতে সময় আছে আর মাত্র পাঁচ দিন। ১১ই সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সুনীল টগরের দুবাই ডি.জি.এম.-এ উপস্থিত থেকে যদি দেশের টেলিকম ইন্ডাস্ট্রির গতিপথ নির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়, তাহলে ধরে নেয়া যেতে পারে যে টেলিযোগাযোগ ইতিহাসের ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আর তা যদি না-ও হয়, তাহলে ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে খেয়েই আরও কয়েক যুগ চলতে হবে বাংলাদেশকে। প্রায় বছরখানেক ধরে বাংলাদেশসহ এশিয়া ও আফ্রিকার গরিব দেশগুলোর উপর চলতে থাকা ডিজিটাল অন্যায় ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার সুনীল টগর, একজন ভারতীয়-আমেরিকান, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম (ব্যাক্তিগত খাতে প্রথম) সাবমেরিন কেবল (ফ্ল্যাগ: ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক এরাউন্ড দ্যা গ্লোব; ১৯৮৯; ২৮,০০০ কি.মি.) এর স্রষ্টা ও সন্মুখনায়ক, বহু চেষ্টা করেও বাংলাদেশকে নিজের ভাল বোঝাতে ব্যার্থ হয়েছেন। অবশেষে আক্ষেপ করে বলেছেন, “আমি একটা ঊটকে কুয়ার কাছে নিয়ে যেতে পারি, কিন্তু জোর করে তাকে পানি খাওয়ানো আমার ক্ষমতার বাইরে” যখন তাকে প্রশ্ন করা হয় টগর কেবল নেটওয়ার্কের পথে বাংলাদেশের অগ্রগতি সম্পর্কে।

এবারে বিস্তারিত। পৃথিবীর বুকে সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ক এর মানচিত্রে লক্ষ করলে দেখতে পাবেন, কি করুণ চিত্র বাংলাদেশের। এ যেন অসংখ সুঊচ্চ ও বিশাল রাজপ্রাসাদের ভিড়ে কোন এক কোনে পড়ে থাকা পোষ্যপ্রাণীর অবহেলিত-ভঙ্গুর কুড়েঘর। একটু হাওয়া লাগলেই যা মুহুর্তের মধে্য ভেঙ্গে যায়, যাচ্ছে। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত যে আবহেলার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের ইন্টারনেট গিয়েছে, তা বাংলাদেশের প্রাপ্য ছিল। ১৯৯৩ সালের ভুলের মাশুল আমরা অনেকবার দিয়েছি, দিচ্ছি এবং আরও দেব। এভাবে চলতে থাকলে এসব করুন চিত্রের কিঞ্চিত পরিবর্তন আসলেও তা হবে বড়জোর ছাড়া কুকুর থেকে গলায় রশি পরা কুকুরে উন্নতি।

অন্যদিকে, নেট-ইন্ডেক্সে লক্ষ করলে দেখবেন, গ্রাহক-পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবার মানদন্ডে বিশ্বের ১৭৬ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৩তম – আফ্রিকার সেনেগাল ও আলজেরিয়ার মাঝামাঝি। ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে মাটির কমতি থাকতে পারে, গাছপাকা ফল-মুল ও খাটি গরুর দুধের যোগান কম থাকতে পারে, কিন্তু ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের এই দৈন্যতা কোনভাবেই ব্যখ্যা করা যায় না, যদি না এই দেশ কোন দীর্ঘস্থায়ী চক্রান্তের শিকার হয়ে থাকে। যে দেশের সাত কোটি মানুষ মোবাইল ফোন কিনতে পারে সে দেশের মানুষ ব্যান্ডউইথ কিনতে পারবে না?

চোখে আঙ্গুল দিয়ে বারবার এই দূরবস্থা এবং এর মূলে থাকা নোংরা চক্রান্ত ও ভবিষ্যত করুণ পরিনতি সম্পর্কে সাবধান করার পরও বাংলাদেশের শীর্ষ-পর্যায়ের সব রাঘব-বোয়ালেরা টিনের চশমা পরে তসবিহ যপছেন কিসের আশায় তা আমাদের জানা-বোঝার বাইরে। যেখানে টগর কেবল প্রায় বিনা পূজি-লগ্নিতে অপেক্ষাকৃত উন্নত প্রযুক্তির সাবমেরিন কেবলের প্রস্তাব দিচ্ছে, সেখানে ৩২০ কোটি টাকা খরচ করে সি.মি.উই-৫ এর নামে আরও এক যুগের জন্য গোলামির বায়না করা কতটা যুক্তিসঙ্গত?

নিজের পয়সায় উৎসব করে সেই উৎসবে বলির পাঁঠা হতে কেন চায় বাংলাদেশ? সুনীল টগর তো শেষমেশ বলেই বসেছেন, মাত্র ৩ লাখ টাকা খরচ করে অন্যত্র বায়না করতে বিদেশ-ভ্রমন করেছেন বলে আপনার কোষাগার খালি হয়ে গিয়েছে তা কেউ বিশ্বাস করবে না। আর এত শর্ট-নোটিসে দুবাই আসার জন্য সময় আপনি আপনার মহামুল্যবান সিডিউল থেকে যোগান দিতে পারবেন না, এরকম ছুতো দেখিয়েও কোন ফায়দা হবে না। আপনার যদি কোন সমস্যা বা অপারগতা থেকেই থাকে, তা-হলে তা অনেক গভীরে।

রেগুলেটরদের চোখ-কান খোলা থাকতে হয়। ভুঁড়ির আগে হাত-পা চালানো জানতে হয় যাতে দেশের প্রয়োজনে আমেরিকা-দুবাই না হোক, এয়ারপোর্ট পর্যন্ত নিজের পায়ে ভর করে দৌড় দিতে পারেন।

শেষ কথা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চাবি-কাঠি এই ব্যান্ডউইথের সময়োপযোগী ও সুদূরপ্রসারী বন্দোবস্ত যদি আজ আমরা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হবে আমাদের সবাইকেই। বিদ্যুৎ-জ্বালানী প্রথম কাচামাল হলে ব্যান্ডউইথ হচ্ছে দ্বিতীয়। এর অপ্রতুল যোগান নিশ্চত করতে না পারলে শিক্ষা, ব্যবসা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ এবং সর্বপোরি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ও বিশেষভাবে তথ্যপ্রযুক্তিকেন্দ্রিক বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভবনা থেকে কয়েক যুগ পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ। সময় কত আছে? আর মাত্র পাঁচ দিন।

আরও পড়ুন:

4 thoughts on “আধুনিক ইন্টানেটের ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ

  1. যদিও টাগারের অফার আকর্ষনীয় – এটি ব্যবসায়িক চমক কিনা ভেব দেখার বিষয়। বিভিন্ন দেশের একটি কনসোর্টিয়াম এর চেয়ে এক ব্যক্তির উদ্যোগ কি বিশ্বাসযোগ্য? যদি এর ভেতর কোন লুকানো চার্জ থাকে। আর এটি প্রায় বিনামূল্যে কে বলল?

    “Another reason to join the Tagare Cable is it will be quite cheap compared to Sea-Me-We-5 in light of the fact that there is no capex requirement and no branch cable penalty.”

    শুনতে ভাল লাগল? মূল ব্যপার হচ্ছে তার লুকানো চার্জ হচ্ছে ১৫ বছর ব্যাপী IRU (Indefeasible rights of use) contract করতে হবে টাগারের সাথে https://en.wikipedia.org/wiki/Indefeasible_rights_of_use

    The IRU refers to the bandwidth purchased after the submarine cable system has sealed the Construction and Maintenance Agreement (C&MA) among the owners or after the system came into service and where the unowned capacity is available. The right of use is indefeasible, so as the capacity purchased is also unreturnable and maintenance cost incurred becomes payable and irrefusable.

    In plainer, but less accurate English, the purchase of an IRU gives the purchaser the right to use some capacity on a telecommunications cable system, including the right to lease that capacity to someone else. However, with that right comes an obligation to pay a proportion of the operating cost and a similar proportion of the costs of maintaining the cable including any costs incurred repairing the cable after mishaps.

  2. ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানী আন্তর্জাতিক কন্সোর্টিয়াম থেকে অনেক বেশি এফিসিয়েন্ট হবে বলেই আশা করা যায়। আর, লক্ষ করবেন, FLAG (http://en.wikipedia.org/wiki/Fiber-Optic_Link_Around_the_Globe) ও কিন্তু তিনি করেছেন। আর, প্রোজেক্ট অক্সিজেনের কথা উইকিপেডিয়ায় কি লেখা আছে পড়ুন। ফরচুন ম্যাগাজিনের মতে সারাবিশ্বে ব্যান্ডউইথের দাম লক্ষনীয়ভাবে পড়ে যাওয়ার পেছনে সুনিল টগরের এই প্রোজেক্টের বিশেষ ভুমিকা ছিল। ব্যক্তি হলেও তিনি কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভেবে দেখতে চাইলে ভাবার জন্য অনেক সময় পাওয়া যাবে। কিন্তু তিনি কি বলতে চাচ্ছেন, কি তার অফার, তা জানতে বি.টি.সি.এল. কে ১১ তারিখে ওখানে উপস্থিত থাকতে হবে।

  3. আর IRU নিয়ে এতো ভিত হওয়ার কিছু তো নেই। SEA-ME-WE-3 ও IRU বেসিসে ছিল (http://www.smw3.com/smw3/SignIn/Download/IRU/Standard%20Agreement/AG-IRU-Final%20(Mar03).pdf) যা তৎকালীন BNP গভর্ণমেন্ট “দেশের সব তথ্য পাচার হয়ে যাবে” বলে দুরে ঠেলে দিয়েছিল। সেরকম ভুল কি আমরা আবারও করব?

Leave a Reply